Wednesday, August 1, 2018

দিপালি

-ফারাজী হাবিবুর রহমান
পাক্কা ত্রিশ মিনিটের পথ হাটিয়া অসিত খুড়ার দোকানে যাইতাম বিড়ি টানিতে। যদিও আমার বাড়ির পাশেই বিড়ির দোকান রহিয়াছিল। দোকান থাকিলে কি হইবে, সেইখানে আমি তো আমার বড়দা, ঠাকুরদাদের সামনে বিড়ি টানিতে পারি না! এই অসাধ্য সাধন করিতে পাক্কা ত্রিশ মিনিট হাঁটিয়াও বিড়ি টানিবার শ্রাদ্ধ করিতে পারিতাম না। কারণ দোকানে যাইয়া দেখিতে পাইতাম কোন এক ঠাকুরদার বয়সের বুড়া কঙ্কাল মা কালির দিব্যি কাটিয়া কোন সতীসাধ্যি নারীকে উলঙ্গ করিতেছে। অশেষ ধৈর্য ধারণ করিবার পর যখন তাহারা দোকানের চালি ছাড়িয়া উঠিতেন তখন দুচারটি বিড়ি লইয়া আড়ালে গিয়া ফুঁকাইতাম।

একদিন বিড়ি ফুঁকাইয়া আসিবার পথে শুনিতে  পাইলাম নারাণ বাগদির কুমারী মেয়েটি সন্তান প্রশব করিয়াছে। যদিও আমরা জানিতাম যে দিপালি দেবীর কোন এক মোসলমান বুড়ো ছবালের সাথে বিবাহ হইয়াছিল। এ কথা আমরা জানিলে কি হইবে বাগদি পাড়ার কোন লোক ইহা কবুল করিতে পারিত না। কারন বাগদি সমাজে সিঁদুর না পরিয়া, সাত পাকে না ঘুরিয়া এবং বাগদি পাড়ার সকল লোককে না খাওয়াইলে সে বিবাহ নাকি মা কালির নিকট কবুল হইতো না।

শাঁখা নাই সিঁদুর নাই তারপর আবার মোসলমান ছবালের সাথে বিবাহ এতো দর্শনপাপে পরিণত হইয়াছে। লোকে বলাবলি করিতেছিল দিপালি দেবীর ঐ পাপ-মুখ দেখিলে নাকি তাহাদেরও নরক দর্শন করিতে হইবে। বাগদি সমাজের লোকেরা আরও বলাবলি করিতেছে, সে নাকি “বেশ্যাবৃত্তি শুরু করিয়াছে”।

মোসলমান বুড়া নাকি তার চাহিদা মিটাইতে অক্ষম। মোসলমানের সহিত বিবাহ, মোসলমান ছবাল মোসলমানের ধর্ম আর দিপালি তাহার ধর্ম পালন করিতেছে। এসব কথা বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে দিপালির দূর সম্পর্কের এক কাকা মন্তব্য করিয়াছিল, দিপালির বেশ্যাপনা না হয় মানিয়া লইলাম কিন্তু এক ঘরে দুই ধর্ম কিভাবে মানিয়া লইব?’ তাহাদের এসব মন্তব্য| শুনিয়া মনে হইতেছিল বেশ্যাবৃত্তি পাপ না হইলেও এক ঘরে দুই ধর্ম পালন  বাগদি সমাজে নরক দর্শনের জন্য সবচেয়ে বড় পাপ।

বাগদি সমাজের লোকেরা দিপালিকে এই সকল অপবাদ দিয়াই ক্ষ্যান্ত হয় নাই। তাহারা আরও বলিয়া বেড়াইতো সে নাকি বাগদি পাড়ার টিনএজ বালকদের দ্বারা নিজের চাহিদা মেটাইতো। যদিও এসকল অপবাদের কোন ভিত্তি ছিল না। তবুও বলিয়া বেড়াইতো। উদ্দেশ্য একটাই তাহাকে ভিটা ছাড়া করা। এই মহা উদ্দেশ্য সাধন করিবার জন্য তাহাদের সহিত যোগদান করিলেন দিপালি দেবীর একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার ভাই ও বোন।

যে ভাইকে ইঞ্জিনিয়ার তৈয়ার করিতে এবং যে বোনের বিবাহ দেবার জন্য সে তাহার নিজের যৌবনকে বিসর্জন দিয়াছিল ঐ মোসলমান ছবালের নিকট। নিজের একমাত্র চাকুরীর অর্থ দিয়া যখন ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ ও বোনের বিবাহ দিতে পারিতেছিল না তখন ঐ মোসলমান বুড়া ছবালকে বিবাহ করিয়া তাহার নিকট হইতে অর্থ লইয়া তাহাদের খরচ যোগাইয়াছিল।

সে সকল দুর্দিনের কথা তাহারা ভুলিয়া গিয়াছে। না ভুলিয়া তো আর উপায় নাই। সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইতে গেলে যে তাহাদের এ কথা ভুলিতে হইবেই। দিপালির যে সন্তানটি হইয়াছিল বড় মুখ করিয়া তাহার নাম রাখিয়াছিল সত্য। কিন্তু বাগদি সমাজে যেসব কর্মকান্ড চলিতেছে তাহাতে সত্য যেন মিথ্যায় পর্যবসিত হইল।

মা দুর্গার আশীর্বাদ লইতে ইঞ্জিনিয়ার মহাশয় তাহার সদ্য বিবাহিত পন্তী  রাধাকে লইয়া বাড়িতে আসিলেন। আসিয়াই মা দূর্গার পূজার্চনা করিবার জন্য মন্ডপে চলিয়া গেলেন। মন্ডপ থেকে ফিরিবার পথে অসিতদার দোকানে বসিয়া একটি দামী সিগারেট  ফুঁকাইতেছিলেন। অসিতদা এই সুযোগটি হাতছাড়া করিলেন না। রীতিমতো দিপালির অপবাদ শুর করিয়া দিলেন। “বাবু আপনি তো ইঞ্জিনিয়ার হইয়া সমাজে নাম কামাইতেছেন” এদিকে আপনার বোন যে গ্রামের ছোড়া বুড়া নাই সবার সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং করিতেছে তাহার কি কোন খবর রাখিতেছেন? ইঞ্জিনিয়ার মহাশয় সিগারেটটি মাটিতে ফেলিয়া হাতির মতো এক পাড়া দিয়া দাপাইতে দাপাইতে বাড়ির দিকে চলিলেন।

দিপালি দেবীর কাছে কিছু না শুনিয়াই উনুন হইতে একটি জ্বলন্ত চলা উঠাইয়া তাহার মুখে চাপিয়া ধরিলেন। দিপালি মা বলিয়া কেকাইয়া উঠিল। চুলের মুঠি ধরিয়া বেদম প্রহার করিতে করিতে বলিতেছিলেন, ‘ছোড়া বুড়া ঘরে আনিস ? কলঙ্কিনি কান খুলিয়া একটি কথা শোন এই মুহূর্তে তুই আমার ভিটা ছাড়িয়া যা, তাহা না হইলে তোর আদরের ললনা চোখের মনি সন্তানকে এখনই চিতায় পাঠাইয়া দিব। এরপর দিপালি তাহার সত্যকে লইয়া একমাত্র আশ্রয় মোসলমানের ঘরে গিয়া উঠিল। কিছুদিন পর কোন এক কালো রাত্রিতে কালনাগিনীর দংশনে তাহার শেষ আশ্রয়টিও জান্নাতে চলিয়া গেল।

 মহাপ্রলয়ের মধ্যে অভাগিনী যখন যে খড়টি চাপিয়া ধরিতেছে তাহাই তাহাকে ছাড়িয়া যাইতেছে। ঈশ্বরের এই পৃথিবীতে জায়গার অভাব নাই কিন্তু দিপালি দেবীর পরিণতি দেখিয়া মনে হইতেছে ঈশ্বরও এখন কৃপণ হইয়া  গিয়াছে। তাহার ঠাঁই  হইয়াছে রেলরাস্তার পাশে ঐ ছোট্ট ঘরটিতে।

ট্রেন চলিয়াছে গন্তব্যে,
সূর্য উঠিয়াছে পূর্ব দিগন্তে।
রেলরাস্তার পাশে একটি ডাস্টবিনে
একটি কাক একটি কুকুর ও সত্যবাবু
একটি ছেড়া রুটি টানটানি করিতেছে।

No comments:

Post a Comment